দীলতাজ রহমান’র গল্প ‘মেঘে ফোটা তারা’ : পর্ব-১

 

 

দী ল তা জ  র হ মা ন
মেঘে ফোটা তারা

বাস থেকে নেমে ময়েনউদ্দিন একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার নিয়ে গ্রামে ঢুকলো। কালো পলিব্যাগে মোড়ানো হাতের ছোট পুটুলিটা অন্ধকারে মিশে একাকার হয়ে গেছে। অবশ্য বুকের ডানার শাদাও গিলে খেতো এ অন্ধকার। বড় রাস্তা থেকে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বাড়িমুখো আলপথে নেমে সে অন্ধকার আরো গাঢ় করতে করতে ধীর লয়ে হেঁটে যাচ্ছে ময়েনউদ্দিন। পথ যেন তার পায়েই পেঁচিয়ে আছে। গেরোলাগা দড়ির মতো। খুলে খুলে শেষ হতে চায় না। অথচ অন্য সববার, মানে সে আগে যে ক’বার এসেছে। যেন রাশি রাশি আনন্দ নিয়ে বাড়ি ঢুকেছে। এই পথ দিয়ে। চেনা কাউকে দেখলে জাপটে ধরে নিজের কথার চেয়ে মেয়ের কথাই তখন বেশি শুনিয়েছে।
হতদরিদ্র মানুষেরা যে জীবন দেখেইনি, তা তারা বিশ্বাস করেই-বা কী করে! তবু নিজের নিজের কল্পনার ক্ষুদ্রপটে নামিয়ে আসমানের পরীর মতো সাজিয়ে দেখেছে, সাদামাটা স্বভাবের, সত্যভাষী ময়েনের কণ্ঠের উপচে পড়া উচ্ছ্বাসে ভাসা তার এতটুকুু সেই মেয়েকে।
তেমন কিছুই না। শহর থেকে দু-এক প্যাকেট চকলেট তার দরিদ্র ভাই বোনদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর জন্যে। আর রঙিন কিছু জামা-কাপড়। কিছু রাবারের খেলনা। আর তাতেই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে সবাই। সে নিজেও। তার আসার খবর শুনে চলে এসেছে তার বোনেরা নিজের নিজের সংসার ফেলে। দু’টি বোন তার। দু’জনারই অভাবের সংসার। একগাদা করে ছেলেমেয়ে। আর ময়েনউদ্দিনকে বাদ দিয়ে ভাই আছে আরো তিনটে। ময়েনউদ্দিন এদের সবার বড়। একত্রিত সবার মধ্যে ময়েনউদ্দিনও খুশিতে ফোয়ারা হয়ে যেত। তার যাপিত জীবনের প্রতিটি ঘটনার বর্ণনা শোনানোর সুযোগ পেয়ে। তার ওপর আছে বাপের ভিটের টান। শেকড়ে না ফিরলে বোঝাই যায় না তার স্বাদ।
গাছপালায় ছাওয়া, তিন পোতায় তিন ভাইয়ের তিনখানা খড়ের ঘর। তার নিজের ঘরখানা কবেই লুটপাট হয়ে গেছে ভাই-বউদের হাতে হাতে। থাকলেই আর কী হতো? হয়তো সেটুকু থাকলে তা সাথী আর স্বাতী হতো না। একজন সেই কবে তার সব টান আকাশের বুকে গেঁথে দিয়েছিলো। ময়েনউদ্দিন আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে আবারও হোঁচট খায়। কাল রাত থেকে শুরু হয়েছে তার এই আকাশমুখো চাওয়া। একটা একটা করে প্লেন যায়, আর সে ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কোন প্লেনে গেলো মেয়েটি? ফিরোজ সাহেবই বা কখন ফিরে গেলেন? সমস্ত রাতটুকু ফিরোজ সাহেব তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার জায়গার কাছে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকেও সে জানতে পারলো না, কোন জাহাজখানা উড়িয়ে নিলো তার পরানপাখিটারে!
রাতটা পার হলো এয়ারপোর্টের কাছেই। ঢুলুনি ছুটে গেলেই দমটা কেমন আটকে আসছিলো। শেষে এই গাঁ-ই তাকে ফিরিয়ে আনলো? কিন্তু সে তো ফিরতে চায়নি নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানায়। কখন, কীভাবে গাবতলী থেকে কেন যে সে বাসে চেপে বসেছিলো? সেই একবছরের ধুলোমাখা পায়ের ছাপ এখান থেকেও যে মুছে গেছে! কেউ চিহ্ন ধরে রাখতে জানে না! চিহ্ন বড় ভার! ‘দুনিয়াদারির আর সব রাতে দেখা স্বপ্ন কইরে দেয়!’ ফোটা কার্পাস তুলোর মতো এখন তার বুকের মধ্যে এই সব বোধের আগুন শুধু গনগনাচ্ছে। তাই বুঝি পায়ে এখন আর ব্যথা টের পাওয়ার বোধটুকু নেই ময়েনউদ্দিনের। তবু সে চলছে নিজের ভিটের ধুলোমাটিতে কারো পায়ের স্পর্শের খোঁজে।
শহর ছেড়ে তার গ্রামে আসা হতো না। সেদিনও এসেছিলো বহুবছর বাদে। ক’দিনে হঠাৎই ন্যুব্জ হয়ে গেছে ময়েনউদ্দিন। প্রতিটি প্লেন যখনই মেঘ ঢেকে ফেলে, তখনই তার পাঁজর পড়ো বাড়ির ইটের মতো ঝুরঝুর করে ভেঙে আসে। পরান পাখিটাকে কোন প্লেনখানা চিলের মতো ছোঁ করে নিলো বাপ হয়ে সে তা জানতে পারলো না? এতদিন তাহলে কী আগলে রাখলো! পরের বাড়ি চাকর খেটে যার জন্য জীবনটা গেলো! নির্দিষ্ট আর কোনো ঠিকানা তার রইল না। সে তো সব বিক্রি করে গেলো ক’দিন আগে এসে!
টলে পড়ে যাচ্ছে ময়েনউদ্দিন। চেনা কারো দেখা পেলে ভালো হতো। ভর সন্ধ্যায় চন্দ্রদিঘলিয়া বাসস্টপজে নেমে, সেখান থেকে অবশ্য চেনা কাউকেই খুঁজতে শুরু করেছে সে। কিন্তু মাঝখানে আরো একটি গ্রাম পার হয়ে তার গ্রাম, সুকতাইল। যার পাড়ে মধুমতি। তার যৌবনের টগবগে মধুমতি মরে এসেছে। কিন্তু তার ভাঙন সে আবার নিজের বুকের মধ্যে নতুন করে শুনতে পাচ্ছে। এত বছর পর আবার সেই সবকিছু ভেঙে নামার আতঙ্ক ফিরে এসেছে? কুয়াশা এমন গাঢ় না হলে হয়তো কেউ তাকে চিনতে পারতো।
বছর সাতেক আগে আরো একবার কিছুদিনের জন্য গ্রামে এসেছিলো। জমি-জমা সংক্রান্ত ব্যাপারে। তখন সবাইকে ডেকে নিজেকে চেনাতে হতো। তখন আগ্রহও ছিলো নিজেকে চেনানোর। যদিও এসেছিলো অনেকগুলো চিঠি পাওয়ার পর। যখনই তার নামে কোন ইনভেলপ গেছে, খুলতেই হুড়হুড় করে তাকে সবগুলো ভাইবোনের আলাদা করে লেখা একগাদা চিঠি বেরিয়ে পড়েছে। সবার লেখায় ওই এক কথাÑ‘মিঞাবাই, জমি নিয়া শরিকের সাতে গ-গোল…আপনি না আসলি মিটতিছে না। ময়েনকে তার ভাইবোনেরা তুইতোকারি করেই বলতো। শেষে ভুল বানানে লেখানো চিঠিতে আপনি সম্বোধনটা বেশ উপভোগ করতো ময়েনউদ্দিন। তবে বানানের ভুল-শুদ্ধ’র ময়েনউদ্দিনই-বা কী বোঝে? বুঝতো সে। উত্তর দেয়ার প্রয়োজন হলে ও-বাড়ির মেয়ে স্বাতীকে বিনয় করে বলতে হতো। সে অবশ্য এমনি লিখে দিতো। তবু অমন বাহানা না করে বললে ময়েনেরই মন ভরতো না। যাকে দিয়ে প্রতিবার ওদের প্রতিটি বাক্যের উত্তর সে লিখিয়েছে। তাকে নিয়েই তো একসঙ্গে এক বাড়িতে কাটিয়ে এলো বিশটি বছর। তবু নিজেকে তার করে রাখার শক্তি হলো না।
সেই পঁচিশ বছর বয়সে ময়েন গিয়ে ঢুকেছিলো জামিল সাহেবের বাসায়। জামিল সাহেবের বয়স তখন ত্রিশের কোঠায়। এক ল্যাজব্যাজে যুবক ময়েন সেদিন কাজ খুঁজতে ঢাকায় এসেছিলো। রাতে রাস্তায় পড়ে ঘুমাতো। আর দিনের আলোর আভাস পেলেই উঠে এদিক সেদিক ছুটোছুটি করতো ক’দিন পর রাস্তায়ই গাঁয়ের একজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সে-ই ডেকে নিয়ে দু’দিন তার এক ঘরের পরিসরে বউ-ছেলেমেয়ের মধ্যে থাকতে দিলো। সেখানে থাকলো ক’দিন। কিন্তু তিনবেলা চার-চারটে খাবার পাতে দিতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠার অবস্থায় একদিন জসিম মিঞা বলেই ফেললো, ময়না ভাই, ডাকায় কামকাইজ পাওয়া সোজা কতা না! তয় তুমি যদি রাজি অও আমি তোমারে এক বাসায় একটা কাম জোগার কইরে দিতি পারি। বাসা বাড়ির কাজ আর কী।’
Ñকী কাজ তা আর ময়নউদ্দিনের জানার সাহস ছিল না। কারণ রিকশা টানাটাও তার শেখা নেই। কুলিগিরিও ভালো পারে না। শরীরের বল তখন নিজেই টের পেতো না। জীবনভর খাওয়ার টানাটানিতে থাকা মানুষ বোঝা নিয়ে হাঁটতে গেলেও তার পা টলে। বউ সফুরা প্রায়ই মুখ ভার করে থাকত তার অকর্মণ্যতার জন্য।
তবু কাজের ধরন জানতে চেয়ে ময়েনউদ্দিন প্রশ্ন করে ফেললে জসিম মিঞা বলতেই বিপদে পড়ে যেত। ময়েনউদ্দিন কোনো ধরনের প্রশ্নের ধারে কাছে গেলো না। সে ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলো কাজের খবরটুকু পেয়েই। বলেছিলো ‘এহনই নিয়া চলো বাই! আমার এহন কাজ দিয়া কতা। এক বছরের বাচ্ছাডারে ফেলাইয়া থুইয়া আইছি। সূতিকা রোগে ওর মা মরলো এহনো চল্লিশটা দিন অয়নাই…।’

 

দীলতাজ রহমান’র গল্প ‘মেঘে ফোটা তারা’ : পর্ব-২