ভয়ঙ্কর রাক্ষসীর মায়াবী জাদুর ফাঁদ!

golam mowla ronyগোলাম মাওলা রনি: রূপকথার রাক্ষসীদের মায়াবী জাদু এবং ভয়ঙ্কর সব নির্মম কর্মকাণ্ডের কথা কমবেশি আমরা সবাই শুনেছি। রাক্ষসীরা সাধারণত অনিন্দ্যসুন্দরী নারীর বেশে ক্ষমতাধর রাজা-মহারাজাদের মন ভুলিয়ে তাদের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে রাজপ্রাসাদে ঠাঁই পেত। গভীর রাতে রাজা যখন ঘুমিয়ে পড়তেন তখন রাক্ষসী রানী বের হতো মানুষ, গরু-ঘোড়া ইত্যাদি হত্যা করে নিজের উদরপূর্তির জন্য। বহুকাল কিংবা বহু বছর ধরে রাক্ষসীরা রাতের আঁধারে রাজ্যের প্রাণিকুল ধ্বংস করে সবার শেষে রাজপুত্র ও রাজকন্যাদের রক্ত পান করার জন্য উঠেপড়ে লাগত। কোনো কোনো রাক্ষসী সবকিছু সাবাড় করে একসময় নিরাপদে রাক্ষসরাজ্যে ফিরে যেত। আবার কেউ কেউ কোনো সাহসী রাজকুমার কিংবা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পীর-আউলিয়া বা সাধু-সন্ন্যাসীর অভিশাপে নিপাত যেত।

আমাদের ছেলেবেলায় মা-চাচি কিংবা দাদা-দাদিদের কাছে রাক্ষসীদের সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি উপরোক্ত গল্পই বাহারি পরিবেশনায় শুনতাম এবং শিশুমনের চিরন্তন কল্পনাশক্তি দিয়ে রাক্ষসীদের একটি চরিত্র ও অভিব্যক্তি অঙ্কন করতাম। আমাদের কাছে দুটো বিষয় খুবই আশ্চর্য বলে মনে হতো। প্রথমত, রাক্ষসীদের স্থান-কাল-পাত্রভেদে শরীর পরিবর্তন অর্থাৎ নারী থেকে হঠাৎ রাক্ষসী হয়ে যাওয়া এবং যথাসময়ে আবার নারীর অবয়বে ফিরে আসা। দ্বিতীয়ত, নারীর বেশে যে রাক্ষসী নানারকম মোহময় মানবীয় আবেদন সৃষ্টি করে রাজার মন ভোলাত, সে-ই আবার রাতের আঁধারে হঠাৎ করে রক্তখেকো রাক্ষসীরূপে মানুষ, জন্তু-জানোয়ার ইত্যাদিকে ইচ্ছামতো বধ করে নিজের ক্ষুধা মেটাত। রাক্ষসীদের নিয়ে বড়রা কেন যে ছোটদের বাহারি গল্প শোনাতেন তা আজ পরিণত বয়সেও আমার মাথায় ঢোকে না। তবে শিশুকালে শোনা রাক্ষসীদের গল্পের মতো মনের সমাজে মানবরূপী দানবদের কুকর্মের বহর দেখলে আমরা তাকে রাক্ষস বা রাক্ষসীর সঙ্গে তুলনা করে হয়তো শৈশবস্মৃতির রোমন্থন করি।

আজকের নিবন্ধে মানবের দানব হওয়ার অন্তর্নিহিত কারণ এবং তাদের রাক্ষসী কর্মকাণ্ডের পেছনে যে নিয়ামক শক্তিটি কাজ করে তা নিয়ে সাধ্যমতো আলোচনা করার চেষ্টা করব। বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করার আগে আমাদের সমাজে প্রচলিত মানবিক মূল্যবোধের পতন, মানুষের ভণ্ডামি এবং নৃশংসতার কয়েকটি উদাহরণ পেশ করতে চাই। প্রথমেই একজন তথাকথিত ভদ্রলোকের কথা বলি যিনি পোশাক-আশাক ও কথাবার্তায় বেজায় চৌকস এবং আপন মতের ধর্মকর্মে গুরুস্থানীয় ব্যক্তি যাকে হিন্দুশাস্ত্রে বলা হয় ঋষি, মুনি বা যোগী। অন্যদিকে ইসলামে তিন শ্রেণির মানুষকে জনগণ শ্রদ্ধা করে আলা হজরত বা উস্তাদ উল আল্লাম হিসেবে ধ্যানজ্ঞান করে। ভদ্রলোকের প্রধান কাজ হলো ধর্মের নামে ভাঁওতাবাজি করে অর্থ উপার্জন, ক্ষমতা অর্জন এবং সেই অর্থ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে দেশ-বিদেশে ভোগবিলাস এবং অবৈধ কর্মের আস্তানা গড়ে তোলা। সাম্প্রতিক সময়ের ভারতের রামরহিম অথবা ভগবান রজনীশ এই প্রকৃতির মানুষ।

এবার কিছু মানুষের ধনলিপ্সার কথা বলি। অর্থ উপার্জনের জন্য তারা পারে না এমন কোনো কুকর্ম নেই। হাজার হাজার মানুষকে পুড়িয়ে মারা, বিধবা, এতিম বা শিশুদের সম্পত্তি হরণ করার জন্য তাদের মেরে ফেলা কিংবা মহলবিশেষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা পেয়ে কোনো নিরপরাধ লোককে মেরে ফেলার পাশাপাশি তারা মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড করতেও সামান্য পিছপা হয় না। ঘুষ, দুর্নীতি, দখল, জবরদখল, হত্যা, লুট, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি যে কোনো কর্মই হোক না কেন কেবল টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা পেলে এই শ্রেণির লোক চোখ বুজে সবকিছু করতে পারে। দেশের স্বার্থ, দশের স্বার্থ— এমনকি স্ত্রী-পুত্র-কন্যার স্বার্থও তারা টাকার বিনিময়ে যার তার কাছে জলাঞ্জলি দিতে পারে। হাজী মস্তান, দাউদ ইবরাহিম, আমাদের দেশের মরহুম এরশাদ শিকদারকে এ ধরনের মানুষ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।

অর্থলোভী মানুষের চেয়ে বহুগুণ ভয়ঙ্কর হলো ক্ষমতালোভী মানুষ। এই শ্রেণির মানুষ মানুষের কল্পনার চেয়েও ভয়ঙ্কর সব রাক্ষসী বা রাক্ষুসে কর্মকাণ্ড করে বসে। কেবল ক্ষমতা লাভের জন্য কিংবা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য সভ্যতার চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেয়। মানুষ, জন্তু-জানোয়ার, বৃক্ষ-লতা, দালান-কোঠা, ঘরবাড়ি ইত্যাদিকে একসঙ্গে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে পোড়ামাটি নীতি বাস্তবায়ন করে। তাদের ক্ষমতার লিপ্সা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। ক্ষমতার জন্য তারা অন্যের জীবন হরণের পাশাপাশি নিজের জীবনকেও ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। এদের কাছে শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, মায়া-মমতা, প্রেম-প্রণয় ইত্যাদি সবকিছুই যেন তুচ্ছ। তারা শয়নে-স্বপনে কেবলই ক্ষমতা এবং ক্ষমতার বিস্তার নিয়ে চিন্তাভাবনা করে ও তা বাস্তবায়নের জন্য এমনসব নিষ্ঠুর পরিকল্পনা গ্রহণ করে যা কল্পলোকের রাক্ষসীদের নির্মমতাকেও হার মানায়। চেঙ্গিস, হালাকু, হিটলার প্রমুখ এই শ্রেণির নরাধমের উত্কৃষ্ট উদাহরণ।

প্রতিটি মানুষের মধ্যেই রূপকথার রাক্ষসীদের চেয়েও ভয়ঙ্কর ও ছলনাময়ী এক মহাক্ষমতাধর এবং বিস্ময়কর রাক্ষসী বাস করে। সাধারণ মানুষের মধ্যকার সেই রাক্ষসীর বিনাশী ক্ষমতা তুলনামূলক কম। কিন্তু অতিরিক্ত বলশালী, মেধাবী, ক্ষমতাবান ও সাহসী মানুষের মধ্যকার রাক্ষসীর প্রলয় ঘটানোর দুর্দান্ত স্পর্ধা মাঝেমধ্যে পৃথিবীবাসীকে বিস্ময়াভিভূত করে তোলে। মানুষের মধ্যকার সেই রাক্ষসীর মূল আবাসস্থল হলো মানুষের মন। মনের মধ্যে বিলাসী প্রাসাদ নির্মাণ করে রাক্ষসীরা প্রথমে মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। তারপর পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে প্রভাবিত করার পর রিপুসমূহকে কুক্ষিগত করে ফেলে। সবার শেষে মানবশরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে শিরা-উপশিরা এবং রক্তের লোহিত ও শ্বেতকণিকাগুলোকে নিজেদের তাঁবেদার ও সেবাদাস বানিয়ে ফেলে। মানুষ যখন পরিপূর্ণভাবে তার অন্তরের অন্তর্নিহিত রাক্ষসের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় তখন তাকে দেখলে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বনের জন্তু-জানোয়ার, কীটপতঙ্গ এবং অশরীরী শয়তান ও প্রেতাত্মারা পর্যন্ত ভয় পেয়ে যায় এবং তাদের এড়িয়ে চলে।

আলোচনার এই পর্যায়ে সম্মানিত পাঠকদের কাছে ভয়ঙ্কর সেই মায়াবী রাক্ষসীর নামটি বাতলে দেওয়া আমার জন্য ফরজ হয়ে গেছে। আমরা এতক্ষণ ধরে ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা কথা বলে যার নামটি উচ্চারণের জন্য তাল-বেতালের বাহানা করলাম সেই মহাক্ষমতাধর জিনিসটির নাম হলো লোভ। আপনি জেনে অবাক হবেন যে, প্রকৃতির তামাম সৃষ্টিকুলের মধ্যে একমাত্র মানুষেরই লোভ নামক ভয়াল এক রাক্ষসী বা সিন্দবাদের দৈত্যের মতো প্রলয়ঙ্করী শক্তিধর একটি অশরীরীর সত্তা রয়েছে; যার কারণে পরিবার, সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সারা দুনিয়ায় মাঝেমধ্যে প্রলয় ঘটে যায়। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার আগে লোভের সংজ্ঞা নিয়ে কিছু বলে নিই। লোভ হলো মানুষের সেই অনাহূত আকাঙ্ক্ষা যা একদিকে যেমন অনৈতিক তেমনি অন্যদিকে অবৈধ ও বেআইনি। লোভ হলো মানুষের সেই আকাঙ্ক্ষা যা প্রত্যক্ষভাবে লোভী মানুষ ছাড়া বাকি সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং পরোক্ষভাবে দীর্ঘমেয়াদে স্বয়ং লোভীকে ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয়। লোভ নামক আকাঙ্ক্ষার কারণে মানুষ তার পরিবার-পরিজন, সমাজ-সংসার ইত্যাদি সব জায়গায় একজন ঘৃণিত, পরিত্যক্ত ও অভিশপ্ত লোক হিসেবে চিহ্নিত হয়। কোনো মানুষ নেহায়েত দায় না পড়লে কিংবা লোভের কবলে না পড়লে সাধারণত লোভী মানুষের দ্বারস্থ হয় না।

লোভ, লালসা ও লিপ্সা প্রায় সমার্থক হলেও শব্দ তিনটির মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। লোভ শব্দটি বস্তুগত। সাধারণত দৃশ্যমান বা স্পর্শযোগ্য সহায়-সম্পত্তির জন্য মানুষ যখন বাঁকা পথে গমন করে অবৈধ, অনৈতিকভাবে অথবা চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, খুন-জখম-রক্তপাত ইত্যাদির মাধ্যমে লোভের বস্তু কুক্ষিগত করে তখন আমরা লোভীকে চাক্ষুষভাবে শনাক্ত করতে পারি। অন্যদিকে লালসা হচ্ছে লোভের একটি ভার্চুয়াল শাখা যা দেখা যায় না কিন্তু জীবাণু বোমা, নার্ভ গ্যাস ইত্যাদির মতো সমাজ-সংসারকে শেষ করে দেয়। পরস্ত্রী, পরের ধন, পদ-পদবি ইত্যাদির প্রতি যখন মানুষ লোভাতুর হয়ে ওঠে তখন তাকে লালসা বলা হয়। লালসা আবার দুই ধরনের। এক ধরনের লালসা যা লোভী ব্যক্তি অনায়াসে চরিতার্থ করতে পারে এবং অন্য ধরনের লালসা যা কোনো দিন চরিতার্থ করতে পারে না।

আগেই বলেছি, লোভ হলো বস্তুগত এবং লালসা হলো অবস্থাগত। সাধারণত ইন্দ্রিয়সুখের জন্য মানুষ লালসাগ্রস্ত হয়। মানুষের যে পাঁচটি ইন্দ্রিয় রয়েছে তাকে রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ ও স্পর্শ দ্বারা সুখানুভূতি দেওয়ার জন্য যে অনৈতিক ও অবৈধ চেষ্টা-তদবির চলে তা-ই লালসা। লোভী ব্যক্তি তার লোভ বাস্তবায়নের জন্য যে ক্রিয়াকর্ম করে তার বেশির ভাগই হয় প্রকাশ্য। অন্যদিকে, লালসাকারীর লালসা চরিতার্থ করার প্রয়াসের বেশির ভাগই গোপন। যারা তাদের লালসা চরিতার্থ করতে পারে তারা মোটামুটি নীরবে-নিভৃতে নিজের এবং অন্যের সর্বনাশ ঘটাতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, লালসা চরিতার্থ করতে অপারগ ও ব্যর্থ মানুষ প্রকাশ্যে যেমন নিজের সর্বনাশ ঘটায় তেমনি তার চেয়েও মরিয়া হয়ে তার প্রতিপক্ষ, সমাজ ও সংসারের সর্বনাশ ঘটানোর জন্য জীবন বাজি রেখে ভবলীলা শেষ করে। ধরুন কোনো লালসাকারী কোনো সুন্দরী রমণীর সঙ্গে রমণ করার জন্য আসক্ত হয়ে পড়ল। সে যদি সফল হয় তবে প্রেমের ছলনায় পরকীয়ার মাধ্যমে নিজেদের অভিলাষ চরিতার্থ করবে। অন্যদিকে, সে যদি ব্যর্থ হয় তবে প্রতিপক্ষের চরিত্র হরণ, তাকে নানাভাবে হয়রানি করা থেকে শুরু করে তার জীবননাশের চেষ্টা শুরু করে দেবে।

লোভ ও লালসার পর এবার নিশ্চয়ই আপনার লিপ্সা সম্পর্কে জানতে ইচ্ছা করছে। লিপ্সা হলো লোভের ছোট ভাই। অথবা লোভ যদি হয় বৃক্ষ তবে লিপ্সা হলো বীজ। মানুষের মনে যখন লোভ দানা বাঁধে তখন সে তা বাস্তবায়ন করার জন্য বড্ড বেপরোয়া, নির্লজ্জ ও বেহায়া হয়ে পড়ে। কিন্তু লোভের এই পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার জন্য যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি দায়ী সেটির নামই লিপ্সা। একজন মানুষ যখন কোনো একটি বিষয়ে লোভ করা বা লালসাগ্রস্ত হওয়ার প্রথম সুযোগটি পায় তখন লিপ্সা নামক ভয়ানক জিনিসটি সর্বপ্রথম মনের মধ্যে দানা বাঁধে যা বাড়তে বাড়তে একসময় লোভে পরিণত হয়। উদাহরণ হিসেবে তেঁতুলের কথা বলা যেতে পারে। এটি দেখামাত্র যখন আপনার মুখে লালা এসে যাবে তখন সেই লালাকে বলা হবে লিপ্সা। পরে লালাকে গলাধঃকরণ করার পর ছলেবলে কৌশলে অন্যের তেঁতুল কোনোরকম বিনিময়মূল্য, অনুমতি, দান-দাক্ষিণ্য বা সম্মতি ছাড়া হস্তগত বা কুক্ষিগত করে ভোগ করার নামই লোভ।

লোভ সাধারণত তিন প্রকারের। প্রথমটি হলো সহায়-সম্পত্তি, ভোগবিলাস, আরাম-আয়েশ, দখল-অর্জন ইত্যাদির লোভ। দ্বিতীয়টি হলো ক্ষমতা, পদ-পদবি-সম্মান ও স্বীকৃতির লোভ। তৃতীয়টি হলো যৌবন, যৌনতা, রূপ ও মৈথুনের লোভ। পৃথিবীর শুরু থেকে আজ অবধি মানুষ যত অনাসৃষ্টি করেছে তার সবকিছুই সে করেছে লোভের বশবর্তী হয়ে। মানুষের মনের মধ্যে লোভ যখন দানা বাঁধে তখন তার বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায়। তার হাত-পা, চোখ, কান, নাক লোভের কবলে পড়ে লোভের বস্তু ছাড়া অন্য কিছু স্পর্শ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। পৃথিবীর সব আকর্ষণ, সুন্দরতম নিয়ামত এবং সুখ-শান্তি পদদলিত করে লোভীর পা সর্বদা লোভের বস্তুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। লোভীর চোখের পর্দায় বায়স্কোপের মতো লোভের সামগ্রী সারাক্ষণ ভাসতে থাকে এবং তার কান পৃথিবীর সব সুর লয় তাল ও ছন্দ পরিহার করে কেবল লোভের গান শুনতে থাকে। অন্যদিকে লোভের নাক জগৎ-সংসারের ফুল, ফল, আতর-অম্বর ইত্যাদির সুগন্ধ অথবা নিকৃষ্টতম বর্জ্যের জঘন্যতম দুর্গন্ধের মধ্যে থেকেও সারাক্ষণ শুধু লোভের ঘ্রাণে আত্মহারা হয়ে হাপিত্যেশ করতে থাকে। লোভী মানুষের রক্ত, হৃদকম্পন, নিঃশ্বাস ও প্রশ্বাস লোভের বিষয়বস্তুর অণু-পরমাণুর সঙ্গে এমনভাবে একীভূত হয়ে যায় যা একমাত্র মৃত্যু ছাড়া পৃথক করা সম্ভব হয় না। পৃথিবীর সব রোগের ওষুধ রয়েছে এবং রোগবালাই নিরাময়ের জন্য ডাক্তার রয়েছে। কিন্তু লোভের জন্য কোনো দাওয়াই কিংবা ডাক্তার-কবিরাজ নেই। একবার যদি লোভ কোনো মানুষকে পেয়ে বসে তবে তার পরিণতি হবে রূপকথার মায়াবী রাক্ষসীর কবলে পড়ার মতো। লোভ নামক ভয়ঙ্কর রাক্ষসীটি প্রথমে লোভীর আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সমাজ-সংসার সুনাম-সমৃদ্ধি, ধর্ম-কর্ম, পদ-পদবি ইত্যাদি ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলবে। তারপর শুরু করবে লোভীর রক্ত-মাংস অস্থিমজ্জা ও মস্তিষ্ক খাওয়া। লোভ নামক রাক্ষসী অত্যন্ত ধীরলয়ে লোভীর উল্লিখিত সবকিছু সাবাড় করার পর একসময় কলজেটা চিবিয়ে খেয়ে তাকে জাহান্নামের অতল গহ্বরে পাঠিয়ে দিয়ে প্রচণ্ড উল্লাসে মহাতৃপ্তি নিয়ে ফিরে যাবে রাক্ষসরাজ্যে অথবা অন্য কোনো লোভীর মনের গহিন অরণ্যে— নতুন বসতি গড়ে তোলার জন্য। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট।