ডায়াবেটিসে পায়ের যত্ন : নীরব ঘাতক থেকে সাবধান

স্বাস্থ্য ডেস্ক: ডায়াবেটিসকে অনেকে বলে নীরব ঘাতক। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস নার্ভ অকেজো করে দেয়। ফলে হার্টের সমস্যাই হোক বা পায়ের অসুখ, কোনো ব্যথা বেদনা টের পাওয়া যায় না। সিরিয়াল কিলারের মতো একে একে জরাজীর্ণ করে দেয় শরীরের এক একটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। জানলে অবাক হবেন গ্রামগঞ্জ থেকে সরকারি হাসপাতালের ডায়াবেটিস ক্লিনিকে অনেকেই আসেন, যাদের পায়ের আঙুল বা কোনো অংশ ইঁদুরে খেয়ে নিয়েছে। অথচ তিনি টেরই পাননি। ঘুম ভাঙতে দেখেন রক্তে ভাসছে বিছানা। এমনই মারাত্মক রোগ হল ডায়াবেটিক ফুট। যত্ন না নিলেই মুশকিল।

 ডায়াবেটিসের পরিণতি আটকান
সমীক্ষায় জানা গেছে, ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে শতকরা প্রায় ২৫ জনের পায়ের সমস্যার আশঙ্কা থাকে। এদের পায়ে আলসার হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। আমাদের দেশে তো বটেই, ইউরোপ আমেরিকার মতো দেশেও প্রতি বছর ডায়াবেটিস রোগীদের ১০ শতাংশের পায়ে আলসার হয়। এদের মধ্যে অনেকেরই পা বাদ দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আসলে আলসার হওয়ার আগেই সাবধান হওয়া দরকার। একবার আলসার হলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময়েই তা নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে। ক্ষত ছড়িয়ে পড়া আটকাতে ওই অংশ কেটে বাদ দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। অথচ কিছু সাবধানতা মেনে শুরুতেই চিকিৎসকের কাছে গেলে যথাযথ চিকিৎসা করে ৪০ শতাংশের বেশি অ্যাম্পুটেশন প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডায়াবেটিসের চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত পায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো ও যত্ন নিলে অনেক দুর্ভোগই এড়ানো যায়।

 পায়ের সংবেদনশীলতা গায়েব
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে নার্ভ কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ডাক্তারি পরিভাষায় একে বলে নিউরোপ্যাথি। ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে পায়ের আলসারের পেছনে আছে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি। হাইপারগ্লাইসিমিয়া অর্থাৎ রক্তের বাড়তি শর্করা এবং মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের কারণে নার্ভ কোষের প্রোটিন ও অত্যাবশ্যকীয় উপাদান গ্লাইকোজেনকে অস্বাভাবিকভাবে ভেঙে দেয়। এর ফলে নার্ভকোষের প্রোটিন কাইনেজ সি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। নার্ভ কোষ এলোমেলোভাবে কাজ করতে করতে ক্রমশ অকেজো হয়ে পড়ে। স্নায়ুতন্ত্রের মোটর, সেনসরি ও অটোনমিক ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে সংবেদনশীলতা ও স্পর্শ কমতে কমতে শূন্যে এসে ঠেকে। না, এখানেই শেষ নয়।

ক্রনিক ডায়াবেটিসের রোগীদের পায়ের স্নায়ুর কাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পায়ের পেশি, হাড়, ত্বক একে একে সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। পেশি দুর্বল হয়ে পড়ায় পায়ের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। পায়ের ত্বকের ঘর্মগ্রন্থি ও স্বাভাবিক তেল নিঃসরণ গ্রন্থিগুলিও অকেজো হয়ে পড়ে। ক্রমশ পায়ের ত্বক শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে যায়। শুষ্ক ত্বকে সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়ে।

এদিকে পায়ের ওপর ভর করেই চলাফেরা করতে হয়, তাই চাপ পড়ে সমস্যা উত্তরোত্তর বাড়তেই থাকে। এদিকে নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চোট আঘাত বা ব্যথার বোধ থাকে না। ফলে কেটে-ছড়ে গেলে বা সংক্রমণ হলে রোগী টেরই পান না। যখন হুঁশ হয়, তখন দেরি হয়ে গেছে। আর এসবেরই মূলে আছে পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ। ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে পেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ পায়ের আলসারের জন্যে দায়ী। ডায়াবেটিসের সঙ্গে কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে এবং ধূমপান করলে রক্তবাহী ধমনির মধ্যে চর্বির পলি জমার আশঙ্কা বেড়ে যায়। প্রধানত কাফ মাসল অর্থাৎ পায়ের ডিমে বেশি সমস্যা হয়।

তাই পায়ের বিশেষ যত্ন না নিলে স্থবির ও গৃহবন্দি হয়ে বাকি জীবন কাটাতে হবে, যা কখনোই কাম্য নয়। তাই বলা হয়ে থাকে, ডায়াবেটিস হবার আগেই সাবধান হতে হবে। আর ওষুধের পাশাপাশি লাইফস্টাইল মডিফিকেশন মাস্ট। সুষম খাবার খান, নিয়মিত এক্সারসাইজ করুন আর পায়ের যত্ন নিন। ভালো থাকুন।