‘কোন পুরুষ দলের মহিলা কোচ দেশে আমিই প্রথম’

এম এ রাজা : জাতীয় পুরুষ হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতার ২৭ তম আসর উপলক্ষে যশোর শামস্-উল-হুদা স্টেডিয়াম দেশ সেরা হ্যান্ডবল খেলোয়াড়দের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। এই মিলন মেলায় সহজেই নজর কাড়ছে সাদা ট্রাকশুট পরা একজন। প্রথমে দেখলেই মনে হবে না তিনি কোন ভদ্র মহিলা। দ্বিতীয়বার তাকিয়ে ভুল ভাঙে। হ্যা, বলছি বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা হ্যান্ডবল দলের অধিনায়ক ডালিয়া আক্তারের কথা। তবে এই প্রতিয়োগিতায় তার পরিচয় ভিন্ন। এবার তিনি এসেছেন ঢাকা জেলা দলের কোচ হয়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় গম্ভীরপ্রকৃতির তিনি। তবে আলাপে পাওয়া গেল প্রাণ খোলা একজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বকে। শুক্রবার খেলা শেষে ‘ওয়ান নিউজ বিডি ডট কমের’র সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে। নিচে সাক্ষাৎকারটির বিস্তারিত-

যশোরে এবারই কি প্রথম?
ডালিয়া : ২০০১-০২ সালে লিগ খেলতে যশোরে প্রথম এসেছিলাম। ২০০৩ সালে জাতীয় মহিলা হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা, ২০০৪ সালেও এসেছি লিগ খেলতে। যশোরে যে কয়টা লিগ হয়েছেÑমোটামুটি তিন চারটে লিগে খেলেছি।

খেলা শুরু কবে এবং কিভাবে?
ডালিয়া : ছোটবেলায় পাড়ায় সব সময় ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করতাম। আমার চাচাতো ভাই, মামাতো ভাইদের সঙ্গে ফুটবল খেলতাম, সাঁতার কাটতাম। আমার সাঁতার দেখে মাদারীপুরের কোচ জিনাত মামা আমাকে বলেন, ‘তুই খেলাধুলা কর, ভালো করবি।’ এরপর একদিন আমাকে হ্যান্ডবল টুর্নামেন্টে নিয়ে যান। আমি জিনস প্যান্ট আর টি শার্ট পরে গিয়েছিলাম। সেটা ১৯৯৫ সালের কথা। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলি ২০০০ সালে। ১৯৯৯ সালে সার্ভিসেস টিম বাংলাদেশ জুট মিল কর্পোরেশন (বিজেএসমি) টিমে জয়েন করি। ওইবারই টানা ১১ বার রানার্সআপ বিজেএমসি প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়। প্রতিযোগিতার মোস্ট অফ দ্যা স্কোর আমারই ছিল।

জাতীয় হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা বেশিরভাগ সময় ঢাকা শহরে হয়। যশোরে প্রথম হচ্ছে। মাঠের বাইরের আয়োজনের দিক থেকে সফল হয়েছে বলে মনে করেন?
ডালিয়া : আয়োজনের দিক থেকে নিশ্চয় ভাল। কেননা এতগুলো জেলাকে একটা জেলাতে অর্গানাইজ করেছে। ৩২ টা টিমের (মোট টিম ২৯টা) এতগুলো লোকের খাওয়া-দাওয়া, থাকা-যোগাযোগের ব্যবস্থা করা একটা সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে যশোর জেলা।

২০০৩ সালে মহিলা হ্যান্ডবলে খেলোয়াড় হিসেবে আর এবার কোচ হিসেবে যশোরের আয়োজন দেখছেন। যদি দুটো প্রতিযোগিতার তুলনা করতে বলি…
ডালিয়া : দুটোকে যদি তুলনা করি-ওই সময়টা বেশি জাকজমকপূর্ণ ছিল। দর্শকের আনাগোনা বেশি ছিল। এবারের আয়োজনে লোকাল দর্শক খুব একটা চোখে পড়েনি। কিন্তু মহিলাদের খেলায়-হোক সেটা যশোরের খেলা, হোক সেটা বিজেএমসি’র, প্রতিটা খেলায় দর্শক ছিল এবং ওই টাইমটাই বেশি জাকজমক ছিল। এখন আয়োজনটা ভাল, তবে দর্শকের উপস্থিতি আগের সময়ে বেশি ছিল।
পুরুষ হ্যান্ডবল হচ্ছে সেখানে আপনি মহিলা কোচ। আপনার মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন ইতিহাস হচ্ছে কিনা?
ডালিয়া : হ্যাঁ, হ্যাঁ… এটা বাংলাদেশের কোথাও নেই মেয়ে হয়ে ছেলেদের কোচ। আমিই প্রথম কোন পুরুষ দলের মহিলা কোচ।

পুরুষ দলের কোচ হিসেবে কোন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন কিনা?
ডালিয়া: না, না। হ্যান্ডবল ফেডারেশন এই ব্যাপারে খুবই সহযোগিতা করে। তারা আমার যোগ্যতা সম্পর্কে জানে, আমাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করে। এটা আমার প্রথম ছেলেদের কোচিং না। আমার জেলা মাদারিপুরে আমি ছেলেদের কোচিং করিয়েছি। আমি যখন কলেজ লাইফ পড়াশোনা করি, তখন থেকে স্কুল, কলেজ লেভের ছেলেদের কোচিং করায়। মাদারিপুর যে জেলা টিম আসছে সেই টিমে কয়েকজন আছে আমার হাত দিয়ে হ্যান্ডবল যাত্রা শুরু। তবে কোন ন্যাশনাল পর্যায়ের টুর্নামেন্টে কোচ হিসেবে যাওয়া ফরমালি এটা।

আন্তর্জাতিক ফুটবলও খেলেছেন আপনি। এমনকি ক্যাপ্টেনও ছিলেন। ফুটবলের ক্যারিয়ার সম্পর্কে জানতে চায়
ডালিয়া : আমি ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মহিলা ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। মোহামেডান ক্লাবে আমি দুইবার খেলেছি। মোহামেডানের ক্যাপ্টেনও আমি ছিলাম। প্রথম কর্পোরেট লিগ যেটা আমি ওইটাতে বিজেএমসি টিমে খেলেছি। বিজেএমসি চ্যাম্পিয়ন টিম। বিজেএমসির ফুটবল টিমে আমি ক্যাপ্টেন ছিলাম। ওর পর থেকে পায়ের সার্জারির কারণে আর খেলা হয়নি। তবে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা একটা ফুটবলের কোচেস ট্রেনিং হয়েছিল ২০১২ সালে। ওইটা আমি করেছি এবং ২০১৪ সালে ফিফার অধীনে ফুটবল ইন্টারডাকশন কোচিং কোচ হয়েছিল সেখানেও আমি ট্রেনিং করেছি।

একসময় যশোরের মহিলা হ্যান্ডবলের নিয়মিত লিগ হতো। আপনিও ওইসব লিগে খেলেছেন। বর্তমানে যশোর হ্যান্ডবলের অবস্থা ভাল না। এ থেকে বের হয়ে আসার জন্য জেলা ক্রীড়া সংস্থার কি করা উচিত বলে মনে করেন?
ডালিয়া : শুধু একমাত্র জেলা ক্রীড়া সংস্থার দায়-সেটা বলবো না। খেলোয়াড় থেকে শুরু করে জেলা ক্রীড়া সংস্থা, যারা ক্লাব চালায় তাদের আছে, ব্যবসায়িদেরও আছে, তারা যদি পয়সা পাতি না দেয় তাহলে টিম কোথা থেকে লিড করবে। কয়েকটা বছর এরা লিগ করেনি। আমার জানা মতে দুই এক বছর আগে লিগটা করেছিল। তবে বাইরের প্লেয়ার নিয়ে এসে ওই মানের লিগটা করতে পারেনি। আমি আশা করি করবে। বের হয়ে আসার জন্য নতুন করে লিগ শুরু করতে হবে। নতুন খেলোয়াড়দের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। খেলোয়াড়দের কিছু সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। যশোরের বিত্তশালী ও ক্রীড়ামোদীদের যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

আপনি প্রায় দুই যুগ হ্যান্ডবল খেলছেন। আপনার দৃষ্টিতে শুরু আর বর্তমানে বাংলাদেশে হ্যান্ডবলের অবস্থাটা সম্পর্কে জানাবেন…
ডালিয়া : পার্থক্যাটা হয়েছে কী, আমাদের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ খুব কম ছিল। ২০০০ সালের পরে গিয়ে আমরা যে ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্টটা খেলেছি সেটা ২০০৮ সালে। তারও আটবছর পরে ২০১৬ তে আমরা সাফ গেমস্ খেলি। আমরা খেলছি না কিন্তু কোন কান্ট্রি বসে নেই। কী ইন্ডিয়া, কী পাকিস্তান কেউ বসে নেই। এশিয়ার অন্যান্য কান্ট্রির একই অবস্থা। ওরা যখন কোন টুর্নামেন্ট খেলবেÑতখন গ্রেডিং বলেন, গ্রাফ বলেন, সেটা ওপরে চলে যাবে। সেক্ষেত্রে আমাদের পাশের দেশ থেকে গ্রাফটা নিচের দিকে গেছে। আমি বলবো যদি রেগুলিটারি থাকতো আমাদের গ্রাফটা ওপরের দিকে যেত। তবে বর্তমানে আইএইচএফ এর কারণে এখন বয়সভিত্তিক হ্যান্ডবল টুর্নামেন্টগুলো আমরা খেলতে পারছি এবং বর্তমানে অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন আমাদের হ্যান্ডবলকে ভাল পেট্রোনাইস করছে। আমাদের যদি অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা থাকতো, ক্রিকেটের পরে যদি কোন খেলা থাকতো-সেটা হ্যান্ডবল। এখনো অবশ্যই আছে। হিসাব করলে ক্রিকেট, ফুটবল তারপরেই হ্যান্ডবলের অবস্থান। এখানে আমাদের সরকার হোক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হোক-তারা যদি এগিয়ে আসতোÑনিশ্চয়ই তাহলে হ্যান্ডবলে সাউথ এশিয়া ধরেই ফেলতাম এবং এশিয়াতেও আমরা একটা ভাল প্রতিযোগিতা দিতে পারতাম। হ্যান্ডবল ফেডারেশনের যদি ক্রিকেটে বোর্ডের মত অর্ধেক টাকা থাকতো, তাহলে আমরা সাউথ এশিয়ার সেরা- তথা এশিয়ান লেভেলটা আমরা ছুঁতে পারতাম আমার বিশ্বাস। অর্থনৈতিক দীনতার কারণে আমরা বিভিন্ন টুর্নামেন্টে যেতে পারি না। হ্যান্ডবল ফেডারেশনের ইচ্ছা থাকলেও আমাদের ট্রেনিং সারা বছর করাতে পারে না।

খেলার বাইরে কী করেন?
ডালিয়া : আমি বিজেএমসিতে আছি। ঢাকার সাউথ ব্রিজ স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষিকা হিসেবে জব করি।

খেলা থেকে অবসরের পর কী করবেন?
ডালিয়া : খেলাধূলা ছেড়ে হয়তো হ্যান্ডবলের সাথেই থাকবো। কোচিং লাইনে থাকার ইচ্ছা আছে। যেহেতু আমি জার্মানি থেকে হ্যান্ডবলের উপর কোসেস ট্রেনিং ও পড়াশোনা করে আইছি। আমি এখন একটা টিমের কোচ হিসেবে আছি। হোক সেটা ছেলেদের। আমি আবার বিজেএমসির ঢাকা জোনের মেয়ে হ্যান্ডবল কোচ। জার্মানিতে আমি থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। থাকিনি, বাংলাদেশ হ্যান্ডবলে কিছু করবো বলে। ভবিষ্যতে ভাল কোন ট্রেনিং এর সুযোগ পেলে আমি আবার যাব। আমার যতটুকু মেধা আছে যখন যে টিম নিয়ে কাজ করবো সেই মেধাটুকু দেয়ার চেষ্টা করবো।

আপনি যখন খেলা শুরু করেছেন ১৯৯৫ সালে-সে সময় মেয়েদের যে কোন খেলায় প্রতিবন্ধকতা ছিল। এখনো মেয়েদের সেই ধরনের বাধা বিপত্তি আছে কিনা?
ডালিয়া : অবশ্যই অনেক চেঞ্জ হয়েছে। তখন কিছু না কিছু বাধা আসছিলো। তবে এখন অনেকের ফ্যামিলি থেকে মেয়েদের খেলাধুলোয় উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।

আপনার ঢাকা দল নিয়ে কতটুকু আশাবাদি বা কতদূর যেতে চান?
ডালিয়া : ঢাকা গ্রুপ পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে আমাদের দুর্ভাগ্যে যে আমরা চ্যাম্পিয়ন বিজিবি দলের গ্রুপে পড়ে গেছি। ছেলেরা এখন খেলছে, শিখছে। বড় টুর্নামেন্ট খেলতে আসলে বড় বড় খেলোয়াড়দের সাথে খেলা, এতে তাদের সাহস বাড়বে, অভিজ্ঞতা বাড়বে এটুকুই আমি চাইছি। যা সেখানো হয়েছে সেটুকু যদি এপ্লাই করতে পারে- তাহলে পরবর্তী ধাপে অন্য কিছু শেখানো হবে। কিছু করতে করতে একটা সময়-একটা লেভেলে পোঁছে যাবে।

তরুন হ্যান্ডবল খেলোয়াড়দের উদ্দেশে কিছু বলেন…
ডালিয়া : চর্চাটা চালিয়ে যেতে হবে। কষ্ট করার মানসিকতা রাখতে হবে। খেলাটাকে ভালবাসতে হবে। কিছু পাওয়ার আশায় খেলার চাইতে আমি কিছু দেব, এই আশাটা করলে একটা খেলোয়াড় বেশিদিন টিকে থাকতে পারে বা ভাল খেলতে পারে। খেলতে আসতে হবে খেলাটা ভালবেসে। কোন কিছুর প্রাপ্তির আশায় না। মোটকথা জোর করে চাঁদ উঠানোর দরকার নেই, চাঁদ উঠলে সবাই দেখতে পারবে।

যশোর আপনার কেমন লাগে?
ডালিয়া : যশোর শামস্-উল-স্টেডিয়াম আমার অন্যতম প্রিয়মাঠ। এই মাঠে আমি ২০০৩ সালে জাতীয় মহিলা হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায় খেলে সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলাম। বেশ কয়েকবার এসেছি। চাই বার বার আসতে।