ভয়ঙ্কর ব্লু হোয়েল গেমসের গ্রাসে শিশু-কিশোররা

ডেস্ক রিপোর্ট: ইন্টারনেটভিত্তিক গেম ‘ব্লু হোয়েল’-এর ফাঁদে পড়ে আত্মঘাতী হয়েছে রাজধানী ঢাকার এক কিশোরী। ‘নীল তিমি’ বা ব্লু হোয়েল নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তান রীতিমতো খাবি খাচ্ছে।

পশ্চিমা দেশে এ গেমসের কুপ্রভাব নিয়ে তোলপাড় চলছে আগে থেকেই। এবার আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেল বাংলাদেশেও। এটিকে দেশের প্রথম আত্মহত্যার ঘটনা মনে করছেন অনেকে। ঢাকার ফার্মগেট এলাকার হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণা (১৩) এ গেমের কারণেই আত্মহত্যা করেছে বলে দাবি করেছেন তার বাবা অ্যাডভোকেট সুব্রত বর্ধন। মৃত্যুর আগে স্বর্ণার লিখে যাওয়া চিরকুট এবং মোবাইল ফোন নিয়ে তার সন্দেহজনক আচরণ আর অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করে তিনি এমন ধারণা করছেন। স্বর্ণার এক ফেসবুক বন্ধুও তার এ ভয়ঙ্কর খেলায় জড়িয়ে পড়ার কথা নিশ্চিত করেছে।

আর এ ঘটনাটি প্রকাশের পর বাংলাদেশের অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে স্বর্ণার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর গতকাল দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়। সন্তানরা ভয়ঙ্কর এ খেলা খেলছে কিনা— এ আশঙ্কায় অনেক অভিভাবক উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পত্রপত্রিকায় এ নিয়ে সচেতনতামূলক লেখা প্রকাশ করা উচিত। আবার যাতে আতঙ্কও না ছড়ায়। সংবাদে কোনোক্রমেই সবিস্তারে বর্ণনা করা সঠিক হবে না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার দায়িত্ব নিতে হবে। এর আগে ‘ব্লু হোয়েল’-এর জন্য ভারতে তিনজন কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যা করেছে। আর পাকিস্তানে এ গেমটির জন্য এখন পর্যন্ত দুজনের আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। প্রাণঘাতী হওয়ায় এরই মধ্যে ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ গেমটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইন্টারনেট থেকে এ গেমের লিংক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গোটা বিশ্বই গেমটি নিয়ে উচ্চমাত্রার সার্বক্ষণিক সতর্কতা অবলম্বন করছে।

২০১৩ সালে প্রথমে রাশিয়ায় এ গেম খেলা শুরু হয়। শিশুদের মধ্যে যারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তাদেরই মূল খেলায় অংশগ্রহণ করানোর জন্য বেছে নেওয়া হয়। এ গেমটিতে অংশগ্রহণকারীদের দেড় মাসে কয়েকটি ধাপে ভয়ঙ্কর কিছু কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এ খেলার মধ্য দিয়ে গেম নিয়ন্ত্রণকারী খেলোয়াড়দের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করেন। খেলার চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে অংশগ্রহণকারীদের আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, মূলত যেসব কিশোর-কিশোরী তাদের পরিবারের সদস্যদের কম সময় দেয় এবং যারা ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত তারাই গেমটি পছন্দ করে। গেমটি খেলতে গিয়ে একপর্যায়ে গেম নির্মাণকারী ফিলিপ বুদেকিনের সঙ্গে এক ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে এ কিশোরীরা। আর ফিলিপ ইন্টারনেটের সহযোগিতায় সেই মেয়েদের অনুভূতি নিয়ে খেলা করে। খেলায় যেসব কিশোর-কিশোরী টিকে যায় তাদের হাত কাটা, উঁচু ছাদের রেলিংয়ের ওপর হাঁটার চর্চা কিংবা কোনো পশুকে হত্যা করে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিতে হয়। অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই আর সহ্য করতে না পেরে এ পর্যায়ে খেলা ছেড়ে দেয়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের সাবেক পরিচালক ডা. হেদায়াতুল ইসলাম বলেন, সাধারণত ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী কিশোর-কিশোরীরাই এ ধরনের ইন্টারনেটভিত্তিক খেলায় আকৃষ্ট হয়। এ ছেলেমেয়েরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন এবং ভিন্ন ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড এলে তা করতে আগ্রহী হয়। তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যম কর্মীদেরও এসব সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা মেনে তা প্রকাশ করা উচিত, যাতে কোনোভাবেই কিশোর-কিশোরী উৎসাহিত না হয়।

ব্লু হোয়েল তাণ্ডব : ফিলিপ বুদেকিন নামের ২১ বছর বয়সী এক রাশিয়ান যুবক এ ভয়ঙ্কর গেমটি তৈরি করেন। ফিলিপ সাইকোলজির শিক্ষার্থী ছিলেন। ফিলিপের তৈরি এ গেম খেলে এরই মধ্যে রাশিয়াতে ১৩০ স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। রাশিয়ার গন্ডি পেরিয়ে এরই মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া এবং ইউরোপেও ব্লু হোয়েল তার তাণ্ডব চালাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকেও আত্মঘাতী হওয়ার খবর মিলেছে। দেখা গেছে, সাধারণত এ খেলায় অংশগ্রহণকারীদের বয়স ১২-২২ এর মধ্যে। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া রাশান এক মেয়ের সঙ্গে দেশটির পুলিশ বাহিনী কথা বলে অনেক তথ্য জানতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার জন্য এরই মধ্যে রাশিয়ার পুলিশ ফিলিপকে গ্রেফতার করেছে। রাশিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আশঙ্কা করছে, এ গেমের ভয়াবহতা এখন ব্রিটেনেও ছড়িয়ে পড়ছে। ব্রিটেনের স্কুলগুলোতে এরই মধ্যে অভিভাবকদের এ গেমের বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। ভয়ঙ্কর এ গেমটি বের হওয়ার পর দুই বছর পরই রাশিয়ায় আত্মহত্যার ঘটনাগুলো ঘটে।