কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবেন না নাসির

স্পোর্টস ডেস্ক : একটা সময় নাসির হোসেন ছিলেন নির্ভার ক্রিকেটারের প্রতীক। তিনি নাকি ব্যাটিং করতে করতে শিস বাজান। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার ম্যাচে তিনিই পারেন তুলির শেষ আঁচড়ে সাফল্যের রং ফোটাতে। নাসিরের পরিচয় তাই ‘মিস্টার ফিনিশার’।

তবে দৃশ্যপটে সে রকম কিছু অনেক দিন ধরে দেখা যাচ্ছে না। নাসির না শিস বাজানোর উপলক্ষ পাচ্ছেন, না পারছেন কোনো ম্যাচকে ‘ইউটার্ন’ এনে দিতে। ঘরোয়া ক্রিকেটে গত মৌসুমে খুব ভালো খেললেও নতুন করে নাসিরের তুল্যমূল্য যাচাই করতে তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকেই সামনে রাখতে হবে! ২০১৫ সালের পর জাতীয় দলে অনিয়মিত হয়ে পড়ায় সেটার অবারিত সুযোগ তাঁর সামনে আপাতত নেই। নির্ভার নাসিরের ওপর এখন বিষম চাপ। জাতীয় দলে তাঁর জায়গায় ভিড় অনেক বেড়ে গেছে। কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেও নামের পাশে দিয়ে রেখেছেন লাল দাগ। সব মিলিয়ে নাসিরের মনের কানে হয়তো সারাক্ষণই স্লোগান বাজছে—লড়াই লড়াই লড়াই চাই। লড়াই করে বাঁচতে চাই।

কিন্তু ক্রিকেটার নাসিরের ‘বাঁচা-মরায়’ তিনি নিজে কোনো লড়াইয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না। কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বীও মনে করেন না। দলে ফেরা নিয়ে তাঁর চিন্তাটাও খুব সহজ-সরল, ‘আমি মনে করি না, আমার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী আছে কিংবা জাতীয় দলে কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী। এখন তারা ভালো খেলছে, দোয়া করি যেন আরও ভালো খেলে। জাতীয় দলের জায়গা সবার জন্য সব সময় উন্মুক্ত থাকবে। ভালো খেললে সুযোগ অবশ্যই আসবে। আমার যেটা করণীয়, আমি করছি।’

ঘরোয়া ক্রিকেটের সর্বশেষ ফর্মটা ধরে রাখতে পারলে জাতীয় দলের চেনা পথে ফিরে আসা কঠিন হবে না, এই বিশ্বাস নিয়ে এগোচ্ছেন নাসির। এখন ফিটনেস ট্রেনিংয়ের ২৯ জন ক্রিকেটারের মধ্যে আছেন, সেখান থেকে ১৪-১৫ জনের দলে আসতে হবে। এরপর চ্যালেঞ্জটা ম্যাচের ১১ জনে ঢোকার। ক্রমেই সরু থেকে আরও সরু হতে থাকবে রাস্তাটা। দুর্বলতা যে কিছু আছে, তা মানেন, ‘আমার অনেক জায়গায় দুর্বলতা আছে সেটা আমি জানি, আমার সতীর্থরা জানে, কোচিং স্টাফ যাঁরা আছেন তাঁরাও জানেন।’ তবে নিজের দুর্বলতা না বলাই অলিখিত নিয়ম। নাসিরও তাই বলেননি, কোথায় তাঁর দক্ষতাকে আরও শাণিত করতে হবে।

নাসিরের আত্মবিশ্বাস, দুর্বলতা নিয়ে চিন্তা—সবই সীমিত ওভারের ক্রিকেটকে ঘিরে। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে কাল নাসিরের কথা শুনে মনে হলো, টেস্ট ক্রিকেটের জন্য নিজের উপযুক্ততা তাঁর নিজের কাছেই ঠিকভাবে প্রমাণিত নয়। সে জন্যই মাথায় অস্ট্রেলিয়া সিরিজ নেই। যাবতীয় প্রস্তুতি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের সীমিত ওভারের ম্যাচগুলোকে নিয়ে। সুযোগ পেলে দলের চাহিদা পূরণের অঙ্গীকার খুঁজে পাওয়া যায় নাসিরের কণ্ঠে। আর টেস্ট নিয়ে লক্ষ্য, ‘আমি যদি অনুশীলন ভালো করি এবং ওই ধরনের অনুশীলন ম্যাচ হয়, তাহলে ওখানে পারফর্ম করে টেস্ট দলে সুযোগ করে নেওয়া।’

প্রিমিয়ার ক্রিকেটে চার নম্বরে খেলে সফল হয়েছেন। লিগ শেষে বলেছিলেন, ওপরে খেলার দায়িত্বই নাকি তাঁকে বদলে দিয়েছে। তবে জাতীয় দলে নিজের জন্য ছয় নম্বর জায়গাটাই পছন্দ নাসিরের, ‘আমার জন্য জাতীয় দলের সেরা ব্যাটিং পজিশন ছয় নম্বর। প্রিমিয়ার লিগে আগে ব্যাটিং করি, কারণ ওখানে ছয়ে ব্যাটিং করলে বড় কিছু করার সুযোগ থাকে না।’

নাসিরকে নিয়ে গত এক-দেড় বছরে অনেক আলোচনারই রসদ এসেছে মাঠের বাইরে থেকে। ফেসবুকে তো দুটি পক্ষই আছে যাদের একদল নাসিরপ্রেমী, আরেক দল নাসিরবিরোধী। নাসির দুই পক্ষকেই গ্রহণ করছেন, ‘আমি জানি না, কেন মানুষ আমাকে ভালোবাসে। তবে এটা মানুষের কাছ থেকে আমার বড় পাওয়া। এ জিনিসটা সবাই পায় না। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।’ নেতিবাচক আলোচনা নিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘যাদের নাম হয়, তাদের বদনামও হয়। এটা সত্যি কথা। আপনি আমাকে এক চোখে দেখবেন, আরেকজন আরেক চোখে দেখবে।’ তবে তিনি একটা জিনিস পরিষ্কার করে দিয়েছেন, খেলার সময় এসব কোনো আলোচনাই মাথায় রাখেন না। ফেসবুক তার কাছে ‘থাকলেও যা, না থাকলেও তা।’ পত্রিকার খবর-টবরে তো নাকি চোখই বোলান না।

এটা হয়তো নির্ভার থাকার ‘নাসিরীয়’ কোনো টেকনিক। তবে স্নায়ুচাপ এড়িয়ে চলার মোক্ষম ওষুধ সম্ভবত বেশি দূরে না তাকানো। কেউ একজন ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চাইলে নাসিরের পাল্টা প্রশ্ন, ‘ভবিষ্যৎ কে দেখেছে? আমি তো দেখিনি। আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি না।’