অনলাইন গেম খেলে ১৩০ জনের আত্মহত্যা!

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক : অনলাইন গেম আসক্তি এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে পৃথিবীতে। অভিভাবকদের দুঃশ্চিন্তার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, নানা বয়সী শিশু কিশোর ও তরুণদের আকৃষ্ট করে বানানো এসব অনলাইন গেম। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা অনলাইন গেমের আসক্তিতে নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে নানা ধরণের সতর্কবাণী দিচ্ছে। তাদের মতে, শিশু কিশোরদের মানসিক বিকাশ ও তরুণদের কর্মস্পৃহা নষ্ট করছে এসব গেম। প্রায় সময় এর মাধ্যমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে নানা অপরাধ কর্মকান্ড ও আত্মহত্যা ঘটানোর খবরের শিরোনাম হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম।

সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’ নামের একটি সোশ্যাল গেমিং-এর নেশায় পড়ে আত্মহত্যা ও নানা অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েছে এ গেমপ্রেমীরা। সংবাদ সূত্রে জানা গেছে,  গত তিন মাসে রাশিয়া এবং পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে মোট ১৬ জন তরুণীর আত্মহত্যার খবর পেয়েছে পুলিশ। এদের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতেই সাইবেরিয়ার দুই স্কুলছাত্রী ইউলিয়া কনস্তান্তিনোভা (১৫) এবং ভেরোনিকা ভলকোভা (১৪) একটি বহুতল ভবনের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। একই সপ্তাহে একাতারিনা(১৫) আরেক কিশোরি ফ্ল্যাট থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হয়। তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’ এর সন্ধান পায়। দ্যা সাইবেরিয়ান টাইমস, ডেইলি মেইল, দ্যা সান, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো কয়েকজন আত্মহত্যাকারীদের ছবি প্রকাশ করে।

এই গেমে প্রতিযোগীদের মোট ৫০টি আত্মনির্যাতনমূলক ধাপ শেষ করতে হয়। নিজেকে ক্ষত করার মধ্য দিয়ে এ গেমসের ধাপগুলো এগিয়ে যায়। শুরুর দিকে আকর্ষণীয় ও তাক লাগানো হলেও শেষের দিকে এই আত্মনির্যাতন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। যার কারণে শুরুর দিকে নেশায় পড়ে গিয়ে শেষের দিকে এসে আর নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হয়ে উঠে না। এ গেমসের ধাপগুলোত অংশগ্রহণ করতে প্রতি ধাপের আত্মনির্যাতনের ছবি গেমিং পেজে পোস্ট করতে হয়। প্রতিযোগিতার একেবারে শেষ পর্যায়ে, অর্থাৎ ৫০তম ধাপের শর্তই হল আত্মহনন। পুলিশের ধারণানুযায়ী, সম্প্রতি ১৬ জন তরুণীই এই গেমের ৫০তম ধাপের শর্ত অনুযায়ী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। রাশিয়া পুলিশের আশঙ্কা, সাম্প্রতিক কালে গোটা বিশ্বে অন্তত ১৩০ জন আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে এই ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’ খেলার মাধ্যমে। ২০১৩ সাল থেকে এ গেমটি জনপ্রিয় হতে থাকে, পরবর্তীতে আত্মহত্যার ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে।

পুলিশের তদন্তে গ্রেপ্তার হয় এই ভয়ঙ্কর গেমের পেজ অ্যাডমিন রাশিয়ান তরুণ ফিলিপ বুদেকিন(২১)। সংবাদ মাধ্যমগুলোতে তার ছবিও প্রকাশ হয়। পুলিশের জেরায় এই গেম চালানোর কথা স্বীকারও করেছে সে। আটটি দলের সহায়তায় এ গেমটি সে নিয়ন্ত্রণ করত। তবে এ কাজের জন্য  নিজেকে অপরাধী মনে ভাবছেন না তিনি। তার মতে সমাজে যারা বেঁচে থাকতে ইচ্ছুক না বা যাদের বেঁচে থাকা উচিত নয় তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে সে সহায়তা করেছে।

তবে আশঙ্কার কথা হচ্ছে রাশিয়ায়  অচল করে দেয়া হলেও ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’ ইউরোপে তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে এ গেমের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে তরুণ-তরুণীরা। যদিও এখনো সেখানে কোন ধরণের আত্মহত্যা কিংবা দুর্ঘটনার ঘটনার সংবাদ পায়নি পুলিশ। সেখানকার মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা এ নিয়ে চিন্তিত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্কমূলক ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে। সমস্যা হচ্ছে, এই গেমিং অ্যাপ মোবাইলে একবার ডাউনলোড হয়ে গেলে তা আর কোনও ভাবেই ডিলিট করা সম্ভব হয় না এবং মোবাইলে ক্রমাগত নোটিফিকেশন আসতে থাকে যার কারণে অনেকেই এতে অংশ নিতে ঝুঁকে পড়ছে। যুক্তরাজ্যের সংবাদ মাধ্যম দ্যা সান এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যে শিশুদের অপরাধপ্রবণতা নিরোধে কাজ করা এনএসপিসিসি অভিভাবকদের প্রতি এ নিয়ে সতর্ক করেছে। বিভিন্ন শহরের স্কুলগুলোতে অভিভাবকদের প্রতি সতর্কতাবাণীর পাশাপাশি শিশুদের প্রতি আরো মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।  সূত্র: দ্যা সান, ডেইলি মেইল, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।