আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার দাবি রোহিঙ্গাদের

ওয়ান নিউজ, কক্সবাজার  : পৈচাশিকতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে মিয়ানমার সরকারের পাঠানো প্রতিনিধি দল বালুখালী ও টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন।

পরিদর্শনের দ্বিতীয় দিন সোমবার সকালে মিয়ানমার প্রতিনিধি দল বালুখালী নতুন বস্তিতে যান এবং তাদের নির্যাতনের বর্ণনা শুনেন।

এ সময় নির্যাতিত রোহিঙ্গারা তাদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত নেয়াসহ ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন। এতে রোহিঙ্গা নির্যাতনে জড়িতদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার দাবির বিষয়টিও স্থান পেয়েছে।

সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তদন্ত দলের সদস্য সচিব জ্য মিন্ট পের নেতৃত্বে  মিয়ানমার প্রতিনিধিদল বালুখালী টালে যান।

এ সময় হঠাৎ বর্ষণে বস্তির রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগময় জীবন দর্শনের সুযোগ হয়েছে প্রতিনিধি দলের। বস্তিতে আশ্রয় নেয়া অন্তত শতাধিক নির্যাতিত নারী-পুরুষের পৃথক সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তদন্ত দল। সেখানে সেনাবাহিনীর নির্যাতনে হাত-পা ভাঙা ও গুলি খাওয়ার দাগ রয়েছে এমন একাধিক নারী-পুরুষ ছিলেন।

সাক্ষাৎকার দেয়া রোহিঙ্গা আবদুর রহমান, লায়লা বেগম, আয়েশা বেগম, নুর আয়েশা বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ব্যাপক নির্যাতনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বালুখালী টালে অবস্থান নেয়া এক হাজার ১০টি পরিবার কয়েকটি এনজিওর সামান্য সহযোগিতায় কোনো মতে দিনযাপন করছে।

নাগরিক অধিকার নিয়ে বাঁচতে স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাবার কথা তাদের কাছে বলা হয়েছে। পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে রাখাইন প্রদেশের মংডুসহ বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী ও রাখাইন যুবকদের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়া, ঘরবাড়ি হারানো ও স্বজনদের খুন হওয়ার কথাও।

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের পোয়াখালী গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান (রোহিঙ্গা ভাষায় উক্কাট্টা) আবুল ফয়েজ জানান, নির্যাতনের শিকার শতাধিক নারী-পুরুষের একটি তালিকা প্রতিনিধি দলকে দেয়া হয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গারা তাদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত নেয়াসহ ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন।

এতে রোহিঙ্গা নির্যাতনে জড়িতদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিচারের দাবির বিষয়টিও স্থান পেয়েছে বলে জানান তিনি। আমাদের সাক্ষাৎকার শুনে মিয়ানমার সামরিক জান্তারা নির্যাতন করেছে বলে স্বীকার করেছে প্রতিনিধি দল।

এদিকে, বালুখালী টালের মাঝি খলিল বলেন, হাতে কোন কাজ নেই। কীভাবে খাবার জুটবে জানি না। পাশাপাশি স্বামীহারা নুর জাহান বলেন, স্বামী নেই, তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোন রকম বেচেঁ থাকা।

তবে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে টেকনাফের লেদার রোহিঙ্গারা বলেন, রাখানইন রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে তদন্ত কমিশন। সেসব কথা শুনেছেনও।

কিন্ত একবারও রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ফিরে যাবে কিনা জানতে চায়নি তারা। এছাড়া সেনাবাহিনীর পাশাপাশি রাখাইন যুবকদের হাতে নির্যাতনের কথাগুলো ভালো মতো গ্রাহ্য করতে চায়নি তদন্ত কমিশন।

মিয়ানমার সরকারের পাঠানো তদন্ত কমিশনের সদস্য সচিব, জ্য মিন্ট পের নেতৃত্বে আসা কমিশনের সদস্যরা হলেন, ড. অং থুন থে, থুন মিনথ, নায়েট সোয়ে, থেথে জিন, কায়েন নেগাই, নায়ন থুন, অ্যং মিনথ, মংছিং থোয়াই, মায়েন্ট ও শাদুল্লাহ শাহ।

তাদের সঙ্গে ছিলেন, কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার চাই লাউ মারমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুরুদ্দিন মো. শিবলী, উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের, টেকনাফ মডেল থানার অপারেশন অফিসার মো. শফিউল আজমসহ আর্ন্তজাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওম) কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধিদল নিজেদের মতো করে সাক্ষ্য নিচ্ছেন। আমরা রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে উভয় দেশের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে সবধরণের সহযোগিতা দিয়েছি। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার কথা প্রতিনিধিদল স্বীকার করেছে। তাদের দেশে গিয়ে কী রিপোর্ট দেয় তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারে ৯ অক্টোবর নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক চৌকি আক্রান্তের ঘটনায় অপারেশন ক্লিয়ারেন্সের নামে প্রায় ৪ মাস ব্যাপী রাখাইন প্রদেশের মংডু, বুচিডং, আকিয়াবসহ বিভিন্ন রোহিঙ্গা অধ্যুষিত পাড়া, গ্রামগুলোতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ব্যাপক তাণ্ডব চালানো হয়।

এ প্রেক্ষিতে সীমান্ত পেরিয়ে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আর্ন্তজাতিক বিভিন্ন মহল থেকে অপারেশনের নামে রোহিঙ্গা নিধনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে অভিযোগ তুলা হয়। মিয়ানমার সরকার বার বার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।